ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২২ এপ্রিল ২১ || ৯ বৈশাখ ১৪২৮    Banglarpratidin.com

ময়মনসিংহে কর্মসৃজন প্রকল্পে ভুয়া মাষ্টাররোলে শ্রমিকের কোটি কোটি টাকা হরিলুট !

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১:২৮ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২১

ময়মনসিংহে কর্মসৃজন প্রকল্পে ভুয়া মাষ্টাররোলে শ্রমিকের কোটি কোটি টাকা হরিলুট !

ময়মনসিংহে কর্মসৃজন প্রকল্পে ভুয়া মাষ্টাররোলে শ্রমিকের কোটি কোটি টাকা হরিলুট !

ময়মনসিংহে সরকারের ত্রাণ ও দূর্যোগ মন্ত্রনালয়ের ২০২০-২১ অর্থ বছরের অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি প্রকল্পে কাগজেপত্রে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া মাষ্টাররোল তৈরী করে শ্রমিকদের কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এনিয়ে ভুক্তভোগী মহলে মিশ্রপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, মফস্বলের কর্মহীন প্রান্তিক শ্রমজীবি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার ৪০ দিনের জন্য কর্মসৃজন প্রকল্প শুরু করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তারা শ্রমিকের বদলে ভেকু মেশিনে নামমাত্র কাজ করিয়ে কোটি কোটি টাকা হরিলুট করছেন। ফলে সরকারের দেয়া অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ময়মনসিংহ জেলার প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ শুরু করার আগে শ্রমিক তালিকা তৈরীর নির্দেশনা রয়েছে। পরে ওই তালিকা যাচাই-বাছাঁই করে চূড়ান্ত হলে কাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইব সাইট এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের বোর্ডে প্রকল্পের নাম ও শ্রমিক তালিকা টানানোর বিধান রয়েছে। কিন্তু জেলার ১৩টি উপজেলার ১৪৭টি ইউনিয়নের কোন উপজেলা বা ইউনিয়নে এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। সরকার এ প্রকল্পের লুটপাট ঠেকানোর জন্য বেশ কয়েকটি সরকারী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতিজন শ্রমিকের বিপরিতে ব্যাংক একাউন্টে টাকা উত্তোলনের নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধিরা এসব নিয়ম না মেনে সিন্ডিকেট গড়ে তোলে ভুয়া শ্রমিক তালিকা মাষ্টাররোলে ভাগ-বাটোয়ার আংশিদার বানিয়ে শ্রমিকদের অধিকার বঞ্চিত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। সূত্রমতে, ময়মনসিংহ জেলায় ২০২০-২১ অর্থ বছরে প্রথম পর্যায়ে ১৩টি উপজেলায় মোট উপকারভোগীর সংখ্যা ৫৯ হাজার ৭৪১জন। এসব শ্রমিকের বিপরিতে মোট অর্থ বরাদ্ধের পরিমান ওয়েজ-ননওয়েজ ও সরদার মিলিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকার অধিক। অভিযোগ উঠেছে, অর্ধশত কোটি টাকা বরাদ্ধে জেলার এ প্রকল্পে শ্রমিকরা উপকারভোগী হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টো। বাস্তবে জেলার সদর, গৌরীপুর, নান্দাইল, তারাকান্দা, ফুলবাড়ীয়া, মুক্তাগাছাসহ সব’কটি উপজেলায় অতিদরিদ্রদের কর্মসৃজন প্রকল্পে শ্রমিকের বদলে কাজ হয়েছে ভেকু মেশিনে। ফলে প্রকল্পের টাকা হরিলুটের জন্য ভুয়া মাষ্টাররোল তৈরী করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজসে টাকা উত্তোলন করে হচ্ছে ভাগ-বাটোয়ারা। জানা যায়, কর্মসৃজন প্রকল্পে জেলার সভাপতি হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসক কিন্তু তদারকির দ্বায়িত্বে কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে থাকেন জেলার ত্রান ও পর্নবাসন কর্মকর্তা। উপজেলা পর্যায়ে এ প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সদস্য সচিব হিসেবে থাকেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা। বিপত্তিটা ঘটে এখানেই। ফলে সরকারী প্রকল্পের টাকা হরিলুটে এখন উর্বর ক্ষেত্র হয়েছে পিআইও অফিস। ইউপি চেয়ারম্যান, সচিব ও মেম্বারগণ পরবর্তীতে এ প্রকল্পের দ্বায়িত্ব পালন করার কারণে প্রকল্প কর্মকর্তার যোগসাজসে তারা শ্রমিকের বদলে ভেকু মেশিনের প্রকল্পের বরাদ্ধের টাকা হরিলুটে মেকানিজম করছেন। ব্যাংক কর্মকর্তারা এক্ষেত্রে ভাগ-বাটোয়ারার অশিংদার হয়ে যান। ভেকু মেশিনের কাজের সত্যতা স্বীকার করেছেন নান্দাইলের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এরশাদ উদ্দিন। তিনি জানান, ভেকু মেশিনের কাজের খবর পেয়ে কাজ বন্ধ করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, তারাকান্দা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জাকারিয়া উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে মোট ২২টি প্রকল্পের আওতায় ৪ হাজার ৮০৪৪ জন তালিকাভুক্ত শ্রমিকের তালিকায় প্রকল্পের কাজ শেষ দেখিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি উপজেলার ডাকুয়া,বালিখা,তারাকান্দা সদর,জালা গাও,কাকানি,বিশকা,কামারিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে শ্রমিকের বদলে কাজ করিয়েছেন ভেকু মেশিনে। কোথাও টানানো হয়নি প্রকল্প সাইনবোর্ড। প্রকল্পে ভেকু মেশিনের সত্যতা স্বীকার করেছেন তারাকান্দার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জাকারিয়া। তিনি বলেন, লেবার কত টাকা পেয়েছে বা না পেয়েছে, সেটা ব্যাংকের বিষয়। আমাদের কয়েকটা প্রকল্পে ভেকু মেশিন দিয়ে কাজ করিয়েছি। একই চিত্র জেলার গৌরীপুর উপজেলার সবকটি ইউনিয়নে। একই ভাবে ভেকু মেশিনে কাজ হয়েছে ফুলবাড়ীয়া উপজেলার বাক্তা, নাওগাঁও, পুটিজানা, এনায়েরপুর, কুশমাইলসহ সবকটি ইউনিয়নে। তবে তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার জান্নাতুল ফেরদৈাস বলেন, বালিখা ইউনিয়নের দুটি প্রকল্পে পরিদর্শন করে কোথাও ভেকু মেশিন ব্যবহার দেখতে পায়নি। পিআইও ভেকু মেশিনের কথা স্বীকার করলে সেটা তার বক্তব্য। অপরদিকে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরনিলক্ষীয়া ইউনিয়নে প্রকল্পে ৫৯৪ জন শ্রমিক তালিকাতে দেখালেও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো ইউনিয়নে কাজ করেছেন মাত্র ২২৭ জন শ্রমিক। প্রকল্পের কার্যদিবস শেষ হলেও উপজেলার কোথাও প্রকল্পের কোন সাইনবোর্ড নেই। প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করতেই কোথাও সাইনবোর্ড ব্যবহার করা হয়নি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। এবিষয়ে চরনীলক্ষিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ফারুকুল ইসলাম বলেন, কোন শ্রমিক কাজের টাকা না পেয়ে থাকলে তা ব্যাংক ও প্রকল্পের সভাপতির দায়ভার। এটা আমার বিষয় না। তবে ময়মনসিংহ সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের অভিযোগ প্রমানিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। জানতে চাইলে ময়মসিংহ সদরের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মনিরুল হক ফারুক রেজা বলেন, আমি এখন ব্যস্ত। এবিষয়ে পরে কথা বলব। কর্মসৃজন প্রকল্পের তদারকি কর্মকর্তা ময়মনসিংহ জেলা ত্রান ও পর্নবাসন কর্মকর্তা সানোয়ার হোসেন জানান, কোথাও প্রকল্পের অনিয়ম চোখে পড়েনি। তবে কিছু এলাকা থেকে মৈখিক অভিযোগ পেয়েছি। কিন্তু লিখিত কোন অভিযোগ নেই। তিনি দাবি করেন, শ্রমিকের বদলে ভেকু মেশিনে কাজ করার কোন সুযোগ নেই। এবিষয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো: মিজানুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের কেউ সুস্পষ্ট অভিযোগ দিলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তবে একজন ব্যাক্তি আমাকে এ বিষয়ে মৌখিক ভাবে জানিয়েছেন। এ ধরনের অনিয়মে কোন ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।